ভারতীয় জাহাজ নিয়ে জল্পনা বাড়ছে, হরমুজ ইস্যুতে ছাড়ের খবর নাকচ করল ইরান
মধ্যপ্রাচ্যে বাড়তে থাকা উত্তেজনার আবহে হরমুজ প্রণালী ঘিরে নতুন করে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক জটিলতা তৈরি হয়েছে। সম্প্রতি খবর ছড়িয়েছিল যে ভারতের সঙ্গে কূটনৈতিক আলোচনার পর ভারতীয় পতাকাবাহী তেলবাহী জাহাজগুলিকে হরমুজ প্রণালী দিয়ে নিরাপদে চলাচলের ক্ষেত্রে বিশেষ ছাড় দিতে পারে ইরান। কিন্তু সেই জল্পনাকে একেবারে নস্যাৎ করে দিয়েছে তেহরান। ইরানের সরকারি সূত্রের দাবি, ভারতের সঙ্গে এই বিষয়ে কোনও আনুষ্ঠানিক চুক্তি বা বিশেষ অনুমতির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। ফলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
হরমুজ প্রণালী বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথ, যার মাধ্যমে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পৌঁছে যায়। ভারতের মতো জ্বালানি আমদানিনির্ভর দেশের জন্য এই পথ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভারতের মোট তেল আমদানির বড় অংশই পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলি থেকে আসে এবং তার বেশিরভাগই এই প্রণালী দিয়ে পরিবাহিত হয়। তাই এই এলাকায় সামান্য অস্থিরতাও ভারতের জ্বালানি নিরাপত্তার উপর সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান সংঘাতের জেরে সাম্প্রতিক সময়ে হরমুজ প্রণালীকে ঘিরে নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও স্পর্শকাতর হয়ে উঠেছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছিল যে ভারতীয় জাহাজগুলির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দিল্লি ও তেহরানের মধ্যে বিশেষ আলোচনাও হয়েছে। এমনকি কিছু সূত্রের তরফে বলা হয়েছিল, ভারতীয় পতাকাবাহী তেলবাহী জাহাজকে এই পথ দিয়ে নির্বিঘ্নে চলাচলের ক্ষেত্রে বাধা দেওয়া হবে না। তবে ইরানের বিদেশ মন্ত্রকের ঘনিষ্ঠ সূত্র জানিয়েছে, আলোচনার বিষয়টি থাকলেও ভারতীয় জাহাজকে বিশেষ ছাড় দেওয়ার মতো কোনও সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি।
ভারত সরকার অবশ্য পরিস্থিতির উপর ঘনিষ্ঠ নজর রাখছে। কূটনৈতিক স্তরে ইরানের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রেখে ভারতীয় জাহাজ ও নাবিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার চেষ্টা চলছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রকের সূত্রে জানা গিয়েছে, পারস্য উপসাগর অঞ্চলে বর্তমানে বহু ভারতীয় বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল করছে এবং সেখানে শতাধিক ভারতীয় নাবিক কর্মরত রয়েছেন। যুদ্ধ পরিস্থিতি বা সামুদ্রিক সংঘর্ষ বাড়লে তাদের নিরাপত্তা নিয়ে বড় উদ্বেগ তৈরি হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, হরমুজ প্রণালীতে উত্তেজনা বাড়লে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দামে বড়সড় ওঠানামা হতে পারে। তার সরাসরি প্রভাব পড়বে ভারতের জ্বালানি ব্যয় এবং অর্থনীতির উপর। ইতিমধ্যেই বৈশ্বিক তেল বাজারে অনিশ্চয়তার ইঙ্গিত মিলতে শুরু করেছে। ফলে পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিকল্প জ্বালানি সরবরাহের পথ এবং কৌশলগত মজুতের বিষয়েও নতুন করে ভাবতে শুরু করেছে ভারত।
এই পরিস্থিতিতে ভারতের কাছে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হল কূটনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখা। একদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্ক, অন্যদিকে ইরানের সঙ্গে ঐতিহাসিক ও জ্বালানি সহযোগিতা—এই দুইয়ের মধ্যে সমন্বয় রেখে পরিস্থিতি সামাল দেওয়াই এখন দিল্লির মূল লক্ষ্য। তবে ইরানের সাম্প্রতিক মন্তব্যে স্পষ্ট, হরমুজ প্রণালী নিয়ে যে জল্পনা তৈরি হয়েছিল তা এখনও নিশ্চিত নয় এবং ভবিষ্যতে পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেবে তা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে জোর জল্পনা চলছে।