মুখ্য সমাচার :
প্লাস্টিক বর্জন থেকে বৃক্ষরোপণ, ছোট ছোট উদ্যোগেই ফিরতে পারে প্রকৃতির হারানো ভারসাম্য গরমে এসি চালাচ্ছেন? স্প্লিট নাকি উইন্ডো—কোন এসিতে বিস্ফোরণের ঝুঁকি বেশি, জানলে অবাক হবেন

প্রতি ৫ জন পুরুষের একজন মধুমেহে আক্রান্ত! উত্তরপ্রদেশের সমীক্ষায় উদ্বেগজনক ছবি

উত্তরপ্রদেশে মধুমেহ বা ডায়াবেটিসের প্রকোপ ক্রমশ ভয়াবহ আকার ধারণ করছে। সম্প্রতি প্রকাশিত একটি বিস্তৃত স্বাস্থ্য সমীক্ষায় উঠে এসেছে উদ্বেগজনক তথ্য। সমীক্ষা অনুযায়ী, রাজ্যের প্রতি পাঁচজন প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষের মধ্যে একজন ডায়াবেটিসে আক্রান্ত। শুধু তাই নয়, বহু মানুষ এখনও জানেনই না যে তাঁরা এই রোগে ভুগছেন। ফলে চিকিৎসার অভাবে নীরবে শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। সমীক্ষার এই ফলাফল প্রকাশ্যে আসতেই স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, চিকিৎসক এবং প্রশাসনিক মহলে উদ্বেগ ছড়িয়েছে।
Pressman
03 June, 2026
সমীক্ষায় উত্তরপ্রদেশের বিভিন্ন জেলা, শহর এবং গ্রামীণ এলাকার হাজার হাজার মানুষের স্বাস্থ্য সংক্রান্ত তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে। তাতে দেখা গিয়েছে, গত কয়েক বছরের তুলনায় ডায়াবেটিস আক্রান্তের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। একসময় শহুরে জীবনযাত্রার সঙ্গে এই রোগকে বেশি যুক্ত করা হলেও বর্তমানে গ্রামীণ এলাকাতেও দ্রুত হারে বাড়ছে আক্রান্তের সংখ্যা। বিশেষজ্ঞদের মতে, আধুনিক জীবনযাত্রার প্রভাব, খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন এবং শারীরিক পরিশ্রম কমে যাওয়ার ফলে এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
সমীক্ষা অনুযায়ী, ৩০ থেকে ৬০ বছর বয়সি পুরুষদের মধ্যে ডায়াবেটিসের প্রকোপ সবচেয়ে বেশি। তবে উদ্বেগের বিষয় হল, ২৫ থেকে ৩০ বছর বয়সি যুবকদের মধ্যেও এই রোগের হার বাড়ছে। চিকিৎসকদের মতে, অল্প বয়সে ডায়াবেটিস ধরা পড়ার অর্থ হল ভবিষ্যতে হৃদরোগ, কিডনি বিকল হওয়া, চোখের সমস্যা এবং স্নায়বিক জটিলতার ঝুঁকি অনেক বেশি বেড়ে যাওয়া। বিশেষ করে কর্মব্যস্ত জীবন, দীর্ঘক্ষণ বসে কাজ করা এবং অনিয়মিত জীবনযাপন এই ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, ডায়াবেটিসকে অনেকেই সাধারণ রোগ বলে মনে করলেও এর প্রভাব অত্যন্ত গুরুতর হতে পারে। রক্তে শর্করার মাত্রা দীর্ঘদিন নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকলে হৃদযন্ত্র, কিডনি, চোখ, স্নায়ুতন্ত্র এবং রক্তনালির উপর মারাত্মক প্রভাব পড়ে। বহু ক্ষেত্রে ডায়াবেটিস থেকেই হৃদরোগ, স্ট্রোক, অন্ধত্ব এবং কিডনি বিকলের মতো জটিল রোগের সূত্রপাত হয়। তাই রোগটিকে অবহেলা না করে প্রাথমিক পর্যায়েই শনাক্ত করা জরুরি বলে মত চিকিৎসকদের।

সমীক্ষায় আরও দেখা গিয়েছে, যাঁরা স্থূলতায় ভুগছেন, উচ্চ রক্তচাপ রয়েছে অথবা নিয়মিত শরীরচর্চা করেন না, তাঁদের মধ্যে ডায়াবেটিসের ঝুঁকি অনেক বেশি। ফাস্ট ফুড, অতিরিক্ত তেল-মশলাযুক্ত খাবার, কোমল পানীয় এবং উচ্চ ক্যালরিযুক্ত খাদ্য গ্রহণের প্রবণতাও আক্রান্তের সংখ্যা বৃদ্ধির অন্যতম কারণ হিসেবে উঠে এসেছে। পাশাপাশি পর্যাপ্ত ঘুমের অভাব এবং মানসিক চাপও ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

চিকিৎসকদের মতে, সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হল অনেক মানুষ রোগের লক্ষণ বুঝতে পারেন না। অতিরিক্ত তৃষ্ণা, বারবার প্রস্রাব হওয়া, দ্রুত ওজন কমে যাওয়া, দুর্বলতা, ক্ষুধা বেড়ে যাওয়া বা ক্ষত শুকোতে দেরি হওয়ার মতো উপসর্গ দেখা দিলেও অনেকেই তা গুরুত্ব দেন না। ফলে রোগটি দীর্ঘদিন অজানা থেকে যায় এবং পরে গুরুতর অবস্থায় ধরা পড়ে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ৩০ বছরের বেশি বয়সিদের বছরে অন্তত একবার রক্তে শর্করা পরীক্ষা করানো উচিত।

স্বাস্থ্য মহলের একাংশের মতে, এই সমীক্ষা শুধুমাত্র উত্তরপ্রদেশ নয়, গোটা দেশের জন্যই সতর্কবার্তা। ভারতের বিভিন্ন রাজ্যেই ডায়াবেটিস আক্রান্তের সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ডায়াবেটিস আক্রান্ত জনগোষ্ঠীর দেশগুলির মধ্যে ভারত অন্যতম। ফলে জনস্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে এটি একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে।

সমীক্ষার রিপোর্ট প্রকাশের পর উত্তরপ্রদেশ সরকারও বিষয়টিকে গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করছে। স্বাস্থ্য দফতর সূত্রে খবর, আগামী দিনে রাজ্যজুড়ে ডায়াবেটিস সচেতনতা অভিযান চালানো হবে। বিভিন্ন জেলা হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রে বিনামূল্যে রক্তে শর্করা পরীক্ষার ব্যবস্থা আরও সম্প্রসারণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি গ্রামীণ এলাকায় স্বাস্থ্যকর্মীদের মাধ্যমে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা শিবির আয়োজনের বিষয়েও আলোচনা চলছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ডায়াবেটিস প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায় হল জীবনযাত্রায় পরিবর্তন আনা। প্রতিদিন অন্তত ৩০ মিনিট হাঁটা বা শরীরচর্চা, সুষম খাদ্য গ্রহণ, ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা, ধূমপান ও মদ্যপান এড়িয়ে চলা এবং নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করানো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি পরিবারে ডায়াবেটিসের ইতিহাস থাকলে অতিরিক্ত সতর্কতা অবলম্বনেরও পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

সমীক্ষার এই ফলাফল স্পষ্ট করে দিয়েছে যে ডায়াবেটিস আর শুধুমাত্র একটি ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য সমস্যা নয়, বরং এটি ধীরে ধীরে বৃহত্তর জনস্বাস্থ্য সংকটে পরিণত হচ্ছে। সময়মতো সচেতনতা বৃদ্ধি এবং প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ না করা হলে আগামী কয়েক বছরে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। তাঁদের মতে, এখনই কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা না হলে ভবিষ্যতে স্বাস্থ্য ব্যবস্থার উপর চাপ বহুগুণ বেড়ে যাবে এবং ডায়াবেটিস দেশের অন্যতম বড় স্বাস্থ্য চ্যালেঞ্জে পরিণত হবে।
Follow Us ই-পেপার