রাশিয়ার তেল ইস্যুতে ভারতের পাশে ট্রাম্প! আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নতুন সমীকরণের ইঙ্গিত
রাশিয়ার কাছ থেকে তেল কেনা নিয়ে ভারতকে চাপে ফেলতে হবে না—মার্কিন প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের এমন মন্তব্য ঘিরে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নতুন করে শুরু হয়েছে আলোচনা। এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প স্পষ্ট করে জানান, ভারতের মতো একটি বড় ও দ্রুত বিকাশমান অর্থনীতির দেশকে নিজেদের জ্বালানি চাহিদা মেটাতে স্বাধীন সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ দেওয়া উচিত। তাঁর কথায়, প্রতিটি দেশেরই নিজের অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষা করার অধিকার রয়েছে, আর সেই কারণেই রাশিয়ার কাছ থেকে তেল কেনার জন্য ভারতের ওপর অযথা চাপ সৃষ্টি করা ঠিক হবে না। ট্রাম্পের এই মন্তব্য সামনে আসতেই আন্তর্জাতিক মহলে শুরু হয়েছে নানা বিশ্লেষণ। বিশেষ করে ইউক্রেন যুদ্ধের পরবর্তী পরিস্থিতিতে রাশিয়ার বিরুদ্ধে কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল আমেরিকা ও ইউরোপের একাধিক দেশ। সেই সময় পশ্চিমা জোটের বহু দেশ রাশিয়ার তেল আমদানি উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে দেয়। কিন্তু ভারত সেই পথ অনুসরণ করেনি। বরং তুলনামূলক কম দামে রাশিয়ার অপরিশোধিত তেল কিনে দেশের জ্বালানি চাহিদা মেটাতে থাকে। এর ফলে আন্তর্জাতিক মহলে বহুবার প্রশ্ন উঠেছে ভারতের অবস্থান নিয়ে। তবে নয়াদিল্লি বরাবরই স্পষ্ট জানিয়েছে, দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখাই তাদের প্রধান লক্ষ্য। বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম তেল আমদানিকারক দেশ হিসেবে ভারতের জন্য সাশ্রয়ী মূল্যে জ্বালানি পাওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সেই কারণেই আন্তর্জাতিক চাপ থাকা সত্ত্বেও ভারত রাশিয়ার সঙ্গে জ্বালানি বাণিজ্য বজায় রেখেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের সাম্প্রতিক মন্তব্য আসলে আন্তর্জাতিক রাজনীতির বাস্তবতারই প্রতিফলন। কারণ বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে ভারতের মতো একটি বৃহৎ অর্থনীতি এবং কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ দেশকে পুরোপুরি উপেক্ষা করা বা চাপে রাখা সহজ নয়। ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব মোকাবিলায় ভারতের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করে আমেরিকা। তাই ভারতকে অস্বস্তিতে ফেলার মতো সিদ্ধান্ত নিতে চাইছে না মার্কিন রাজনৈতিক মহলের একটি বড় অংশ। অন্যদিকে রাশিয়ার সঙ্গে ভারতের সম্পর্কও বহু দশকের পুরোনো। প্রতিরক্ষা সহযোগিতা থেকে শুরু করে মহাকাশ গবেষণা, পারমাণবিক শক্তি এবং জ্বালানি ক্ষেত্রে দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘদিনের কৌশলগত সম্পর্ক রয়েছে। ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হওয়ার পরও সেই সম্পর্ক পুরোপুরি ভাঙেনি। বরং নতুন বাস্তবতায় ভারত এক ধরনের ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতি বজায় রাখার চেষ্টা করেছে। একদিকে আমেরিকা ও পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ক শক্তিশালী রাখা, অন্যদিকে রাশিয়ার সঙ্গেও ঐতিহাসিক সহযোগিতা বজায় রাখা—এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করাই এখন ভারতের কূটনৈতিক কৌশলের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। ট্রাম্পের মন্তব্য সেই ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থানকেই যেন পরোক্ষভাবে স্বীকৃতি দিয়েছে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের একাংশ। তাঁদের মতে, বিশ্ব রাজনীতির বর্তমান পরিস্থিতিতে শক্তির সমীকরণ দ্রুত বদলাচ্ছে। একসময় যেখানে পশ্চিমা শক্তিগুলিই আন্তর্জাতিক নীতিনির্ধারণে প্রভাব বিস্তার করত, সেখানে এখন উদীয়মান অর্থনীতিগুলিও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে শুরু করেছে। সেই তালিকায় ভারতের অবস্থান দিন দিন আরও শক্তিশালী হচ্ছে। তাই ভারতের মতো একটি দেশের ওপর প্রকাশ্যে চাপ সৃষ্টি করা কূটনৈতিকভাবে সবসময় সুবিধাজনক নয়। পাশাপাশি জ্বালানি বাজারের বাস্তবতাও এই সমীকরণকে প্রভাবিত করছে। বিশ্ববাজারে তেলের দাম ওঠানামা করলে তার প্রভাব সরাসরি পড়ে উন্নয়নশীল দেশগুলির অর্থনীতিতে। তাই তুলনামূলক কম দামে জ্বালানি পাওয়া গেলে সেই সুযোগ হাতছাড়া করতে চায় না অনেক দেশই। ভারতও তার ব্যতিক্রম নয়। ইউক্রেন যুদ্ধের পর রাশিয়া আন্তর্জাতিক বাজারে ছাড় দিয়ে তেল বিক্রি শুরু করলে ভারতসহ একাধিক দেশ সেই সুযোগ কাজে লাগায়। ফলে রাশিয়ার তেল ভারতের আমদানির একটি বড় অংশে পরিণত হয়। কূটনৈতিক মহলের মতে, ট্রাম্পের এই মন্তব্য হয়তো ভবিষ্যতের রাজনৈতিক বার্তাও বহন করছে। কারণ আমেরিকার রাজনীতিতে ট্রাম্প এখনও অত্যন্ত প্রভাবশালী একটি নাম, এবং তাঁর বক্তব্য অনেক সময় আন্তর্জাতিক নীতিনির্ধারণের সম্ভাব্য দিকনির্দেশও তুলে ধরে। সব মিলিয়ে রাশিয়ার তেল ইস্যুতে ভারতের অবস্থানকে ঘিরে যে আন্তর্জাতিক চাপ ও বিতর্ক তৈরি হয়েছিল, ট্রাম্পের মন্তব্য তা কিছুটা হলেও নতুন দৃষ্টিভঙ্গি এনে দিয়েছে। এখন দেখার বিষয়, আগামী দিনে বিশ্ব রাজনীতির এই জটিল সমীকরণের মধ্যে ভারত কীভাবে নিজের কূটনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখে এবং জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করে। আন্তর্জাতিক মহলের নজর এখন সেদিকেই।